কিডনি এবং কফির সম্পর্ক । কফির উপকার
কিডনি এবং কফির সম্পর্ক কী? কফি খেলে কি কিডনির ক্ষতি হয়? কফি কিডনির জন্য ভালো
না খারাপ? আজকের আর্টিকেলে আমরা এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর জানবো এবং কিডনির সাথে
কফির সম্পর্ক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।
এই আর্টিকেলে যা যা থাকছে
সূচনাঃ কিডনি এবং কফির সম্পর্ক
কফি পান করার সাথে কিডনির কী সত্যি সম্পর্ক আছে? কফি খেলে কিডনির ওপর কী প্রভাব
পড়ে? এমন অনেক প্রশ্ন মাঝে মধ্যে মাথায় ঘুরপাক খায়। কারন আমাদের মধ্যে অনেকেই
সকালে কফি পান করে দিন শুরু করেন। আবার কেউ আছেন Energy Boost করার জন্য দিনের
বিভিন্ন সময়ে এই পানীয় পান করে থাকেন। এই ব্যাপক চাহিদার কারণে কফি আজ বিশ্বের
অন্যতম জনপ্রিয় পানীয়তে পরিণত হয়েছে।
জনপ্রিয়তা এবং আধুনিক জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকার কারনে কফি এখন হাজার
হাজার গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। আকর্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে এই সকল গবেষণার
অন্যতম বিষয়বস্তু হলো মানবদেহের নানা অঙ্গের ওপর কফির প্রভাব বিশ্লেষণ করা। বিশেষ
করে মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেচন অঙ্গ কিডনির ওপর কফির কী প্রভাব পড়ে তা
নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন।
অনেকের ধারণা কফি কিডনির ক্ষতি করে। আবার সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে পরিমিত কফি পান
কিডনিকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু আসল সত্য কোনটি? চলুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার
বিশ্লেষণ এবং বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে জেনে নেওয়া যাক।
কফির উপাদান । কফিতে কী থাকে
কিডনির ওপর কফির প্রভাব বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে এর প্রধান উপাদানগুলো
সম্পর্কে। উপাদানগুলো জানা থাকলে কোনটির কী কাজ এবং তা কীভাবে কিডনিকে প্রভাবিত
করে সেটি বুঝতে সুবিধা হবে। কফি শুধু একটি সাধারণ পানীয় নয়, এর মধ্যে রয়েছে
হাজারের বেশি রাসায়নিক উপাদানের জটিল সংমিশ্রণ।
কফির প্রধান উপাদানগুলোর একটি হলো ক্যাফেইন (Caffeine). কফি বিনের ধরণভেদে তৈরি
করা প্রতি ১০০ মিলি কফিতে ক্যাফেইনের মাত্রা ৪০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে
পারে।
এর পরের উপাদানটি হচ্ছে Antioxidants. কফি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের অন্যতম সমৃদ্ধ
উৎস। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পরিমাণ কফির Roast Level-এর ওপর অনেকটা নির্ভর করে।
এছাড়াও কফিতে রয়েছে সামান্য পরিমাণে বিভিন্ন খনিজ এবং ও অন্যান্য জৈব সক্রিয়
উপাদান।
আমাদের দেহে কফির প্রভাব
কিডনির ওপর কফির প্রভাব জানার পূর্বে সংক্ষিপ্তভাবে জনে নেওয়া যাক মানবদেহের জন্য
কফি পানের উপকারিতা বেশি না অপকারিতা। অর্থাৎ আমাদের দেহে কফির কী প্রভাব পড়ে তা
একটু আলোচনা করা যাক।
কফি মানবদেহে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বহুমুখী প্রভাব ফেলে। কফিতে থাকা ক্যাফেইন
আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে ক্লান্তি দূর করে এবং মনোযোগ
বাড়ায়। ক্যাফেইন মস্তিষ্কের অ্যাডেনোসিন রিসিভটর ব্লক করে কর্মউদ্দীপনা বাড়িয়ে
তাৎক্ষণিক কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং ডোপামিন নিঃসৃত করে মেজাজ প্রফুল্ল রাখে।
সাময়িকভাবে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বাড়াতে কফি বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে
পরিমিত পানে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। কারন ১৯৮৭ সালের একটি ইতালীয়
গবেষণা থেকে জানা যায় যে, কফি রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
শরীরের বিপাক ও পরিপাক প্রক্রিয়াতে কফির গুরুত্ব রয়েছে। এটি শরীরের বিপাক
কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে দেহের চর্বি গলতে সাহায্য করে। এছাড়াও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট
বৃদ্ধিতে এবং কোষের প্রদাহ কমাতে কফি খুব কার্যকরী। সুতরাং বলা যেতে পারে
অপকারিতার থেকে কফি পানের উপকারিতা অনেক বেশি।
কিডনির সাথে কফির সম্পর্ক কীভাবে ?
দেহের বিভিন্ন অঙ্গে কফির যে কিছু বিশেষ প্রভাব রয়েছে তা অনেকটা স্পষ্ট।
মানবদেহের কিডনিতে কফি কী প্রভাব ফেলে এখন এই বিষয়টি নির্দিষ্টভাবে আলোচনা করা
যাক। এরপর কিডনি এবং কফির সম্পর্কটি সহজে বুঝা যাবে।
ইতোমধ্যে আমরা জানি যে, কফির প্রধান সক্রিয় উপাদানগুলোর একটি হলো ক্যাফেইন। যা
শরীরে উদ্দীপনা বাড়াতে কাজ করে এবং সাময়িকভাবে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়াতে
পারে। কিডনি যেহেতু রক্ত পরিশোধন ও শরীরের তরল, লবণ এবং বিভিন্ন খনিজের ভারসাম্য
নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেক্ষেত্রে ক্যাফেইন পরোক্ষভাবে
কিডনির কার্যক্রমকে প্রভাবিত করবে এটাই স্বাভাবিক।
তবে কফিতে শুধু ক্যাফেইন থাকে না। এতে বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য জৈব
সক্রিয় উপাদানও রয়েছে। এই উপাদানগুলো আমাদের শরীরে প্রবেশ করে রক্তে মিশে যাই।
যা পরবর্তীতে কিডনির মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে দেহের অন্যান্য অঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা
থাকে। সুতরাং বিষয়টি পরিষ্কার যে কিডনির সাথে কফির সম্পর্ক রয়েছে।
কফি কি কিডনির ক্ষতি করে ?
কিডনির সাথে কফির সম্পর্ক আছে এটা নিশ্চিত। এখন জানতে হবে সম্পর্কটি ইতিবাচক না
নেতিবাচক। অর্থাৎ কফি কিডনির ক্ষতি করে না উপকার করে।
সাধারণভাবে পরিমিত কফি পান করলে সুস্থ মানুষের কিডনি নষ্ট হয় এমন শক্তিশালী
প্রমাণ বর্তমানে নেই। বরং সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ আবার
কিছু ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপকারী বা ইতিবাচক সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করেছে।
Johns Hopkins Medicine গবেষকদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কফি
পান করেন না তাদের তুলনায় যারা প্রতিদিন অন্তত এক কাপ কফি পান করেন তাদের Acute
Kidney Injury (AKI) বা কিডনি বিকলতার ঝুঁকি কমতে পারে। Kidney International
Report নামক একটি জার্নালে ২০২২ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণার ফলাফলে দেখা
গেছে, যারা প্রতিদিন যেকোনো পরিমাণে কফি পান করেন তাদের AKI বা কিডনি বিকলতার
ঝুঁকি ১৫% কম থাকে।
অর্থাৎ, “কফি খেলে কিডনি নষ্ট হয়” বা “কফি কিডনির ক্ষতি করে” এমন ধারণা সঠিক
নয়। আবার “কফি কিডনি ভালো রাখে” বা “কফি কিডনির জন্য উপকারী” এটিও ১০০% দাবি করা
যাবেনা। কিন্তু বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে বলা যেতে পারে
পরিমিত কফি পান মানবদেহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
কিডনির সমস্যা থাকলে কি কফি খাওয়া যাবে ?
কিডনির সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে কফি খাওয়া যেতে পারে। প্রাথমিক বা
মাঝারি স্টেজের কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে
হবে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না নিয়ে কফি পান করা যাবেনা কারন অতিরিক্ত ক্যাফেইন
রক্তচাপ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে যা পরবর্তীতে কিডনির ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
National Kidney Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, পরিমিত কফি অনেক কিডনি রোগীর
খাদ্যতালিকায় থাকতে পারে। তবে Chronic Kidney Disease এর ক্ষেত্রে কফির পরিমাণের
পাশাপাশি পটাশিয়াম, ফসফরাস, অন্যান্য তরল উপাদান এবং রক্তচাপের বিষয়গুলো
বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
কারন Black Coffee এবং বিভিন্ন ধরনের Flavored Coffee বা Creamer যুক্ত Coffee এক
জিনিস নয়। দুধ বা Cream যোগ করলে পানীয়টির Potassium ও Phosphorus-এর পরিমাণ
উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। যা কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে বিপদজনক হতে পারে।
তাই কিডনির সমস্যা বা কোনো রোগ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে কফি পান করা জরুরি।
কফি পানের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও নিয়মাবলী
কেবল কিডনি রোগ থাকলেই কফি পানে সাবধান হতে হবে, তা কিন্তু নয়। একজন সুস্থ
মানুষের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য এবং কফি পানে সতর্ক থাকা জরুরি। কফি পান করার
সময় সতর্ক থেকে যে কয়েকটি নিয়ম বিবেচনা করা যেতে পারেঃ
১) কফির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন। প্রতিদিন অনেক কাপ কফি পান করার পরিবর্তে পরিমিত
পরিমাণে পান করা ভালো। মনে রাখবেন অতিরিক্ত Caffeine ঘুমের সমস্যা, অস্থিরতা,
হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা রক্তচাপ বৃদ্ধির মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।
২) কফিতে কী যোগ করছেন তা দেখুন। অতিরিক্ত Cream, Milk ও Syrup কফির স্বাদ বৃদ্ধি
করলেও পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দিতে পারে।
৩) সঠিক সময় অনুযায়ী কফি পান করার অভ্যাস করুন। সকালে হালকা কিছু খাওয়ার পর কফি
পান করা সবচেয়ে ভালো। খালি পেটে বা ঘুমানোর ঠিক আগে কফি খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
৪) মোট তরল গ্রহণের হিসাব রাখুন। কিছু কিডনি রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক দৈনিক তরল
গ্রহণের পরিমান সীমিত করে দিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কফিকেও দিনের মোট তরল গ্রহণের
অংশ হিসেবে বিবেচনা করুন।
৫) যারা নিয়মিত কফি পান করেন তাদের অবশ্যই রক্তচাপ পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। কফি
পান করার পর যদি আপনার Blood Pressure বেড়ে যায়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা
করুন।
কিডনি সুস্থ রাখতে কফির চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
কিডনি সুস্থ রাখার জন্য শুধু কফি পান করা বা না করা নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে
সামগ্রিক জীবনযাপন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান, রক্তচাপ
নিয়ন্ত্রণে রাখা, Diabetes থাকলে Blood Sugar নিয়ন্ত্রণ করা, অতিরিক্ত লবণ ও
অস্বাস্থ্যকর খাবার কমানো, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ধূমপান এড়ানো এবং
প্রয়োজন অনুযায়ী Kidney Function পরীক্ষা করা কিডনি স্বাস্থ্যের জন্য
গুরুত্বপূর্ণ।
লেখকের ব্যক্তিগত মতামত
কিডনি এবং কফির সম্পর্ক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইতিবাচক। বর্তমান
প্রমাণ থেকে বলা যায়, পরিমিত কফি পান সাধারণভাবে সুস্থ মানুষের কিডনির জন্য
ক্ষতিকর নয়। কিছু গবেষণায় কফি গ্রহণের সঙ্গে কিডনি সংক্রান্ত সমস্যার কোনো
সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বরং পরিমিত কফি পান কিডনির কার্যকারিতা বজায় রাখতে এবং
কিডনির বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
তবে এসব ফলাফল থেকে কফিকে কিডনি রক্ষাকারী হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কফি
কিডনির জন্য সব সময় উপকারী এইটা না ভাবার জন্য পাঠকদের বিশেষ অনুরোধ করা হচ্ছে।
মাঝে মধ্যে কফি কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে কিডনি রোগে আক্রান্ত
ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কফির পরিমাণ ও সবগুলো বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
মনে রাখা দরকার, কফি নিজে কিডনির জন্য বিষ নয়, আবার কিডনি ভালো রাখার ঔষুধও নয়।
এটি পানের ক্ষেত্রে পরিমিত গ্রহণ এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে
সামঞ্জস্য রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি
স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে নিজের খাদ্য তালিকায় কফি আনার আগে চিকিৎসক বা
নিবন্ধিত Dietitian-এর পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

তথ্যবহুল
ধন্যবাদ